সাংবাদিক নিয়োগঃ
আজকের নোয়াখালী শিক্ষানবীশ সাংবাদিক নিয়োগ - আগ্রহীরা সিভি পাঠিয়ে দিন আমাদের মেইলঃ ajkernoakhali2019@gmail.com এ
যৌথ প্রযোজনার ফাঁকফোকর

যৌথ প্রযোজনার ফাঁকফোকর

যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত নবাব ছবিতে শুভশ্রী ও শাকিব খানযৌথ প্রযোজনার পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে চলচ্চিত্রপাড়া। সংকট নিরসনে সম্প্রতি (১৩ জুলাই) তথ্য মন্ত্রণালয় ‘যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ নীতিমালা-২০১২ (সংশোধিত)’-কে যুগোপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নিয়েছে। গঠিত হয়েছে নয় সদস্যের কমিটি। এক মাসের মধ্যে কমিটি নতুন নীতিমালার খসড়া দেবে। এক মাস পূর্ণ হতে বেশি সময় আর বাকি নেই।

যৌথ প্রযোজনার ছবির নীতিমালার উদ্দেশ্য কী, সেটা স্পষ্ট। অস্পষ্ট কেবল সেই উদ্দেশ্য কীভাবে সাধিত হবে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নীতিমালা করার আগে পুরোনো নীতিমালার কিছু ফাঁকফোকরে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

সমানুপাতিক ধোঁয়াশা

বলা হচ্ছে, ‘প্রতি দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীর সংখ্যানুপাত সাধারণভাবে সমান রাখতে হবে’ (অনু-৬)। কিন্তু নীতিমালায় শিল্পী বা কলাকুশলী বলতে এখানে কী বলা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাই নেই। একটি ছবিতে অভিনয়শিল্পী ছাড়াও সংগীতশিল্পী, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, শিল্পনির্দেশকসহ অনেক ধরনের শিল্পী কাজ করেন। তবে কি তাঁদের ক্ষেত্রেও সংখ্যাটা সমানুপাতিক হবে? নীতিমালা আবার বলছে, ‘সংখ্যানুপাতটা সাধারণভাবে সমান থাকবে।’ তার মানে কি বিশেষ পরিস্থিতিতে সমান না হলেও চলবে? তখন কতটা ছাড় দেওয়া যাবে?

মুখ্য শিল্পী তথা নায়ক-নায়িকা সমান হওয়ারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এক দেশ থেকে নায়ক-নায়িকা, ভিলেনসহ ৩০ জন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর বিপরীতে অন্য দেশ থেকে সংঘাতদৃশ্য বা দলীয় নাচের জন্য ৩০ জনকে নিলে কিচ্ছু বলার নেই। কিংবা এক দেশ থেকে পরিচালক, শিল্পনির্দেশক, নৃত্য পরিচালকসহ প্রধান ২০ জন কলাকুশলীর বিপরীতে আরেক দেশ থেকে ২০ জন লাইট বয় ও খাবার সরবরাহকারী নেওয়া হলেও নীতিমালার শর্ত পূরণ হয়।

নীতিমালায় আছে, যৌথ প্রযোজনার ছবিতে লোকেশন হবে সমান সমান (অনু-৬)। তাত্ত্বিক এ নীতি সম্পূর্ণ অবাস্তব। কারণ, গল্পের প্রয়োজনে লোকেশন হয়, লোকেশনের প্রয়োজনে গল্প হয় না। তার চেয়ে বরং গল্পে প্রতিটি দেশের সমান গুরুত্ব থাকতে হবে, এমন বিধানই সংগত হতো।

নকল ছবিও নীতিমালাসম্মত?

নীতিমালার কোথাও বলা নেই, গল্পটি মৌলিক হতে হবে। কেবল একটি জায়গায় বলা আছে, যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা অনুসরণে নির্মিত কোনো ছবি যদি ‘পুরানো বা নির্মাণাধীন বিদেশি অথবা বাংলাদেশি চলচ্চিত্র থেকে যেকোনো ধরনের নকল’ হয় (অনু-১২), তবে তা প্রেক্ষাগৃহে দেখানো যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যৌথ প্রযোজনার একাধিক আলোচিত ছবি নকল। যেমন আশিকি (২০১৫) তেলেগু ইশক-এর (২০১২) নকল। শিকারী (২০১৬) ও তামিল আদাভান-এর (২০০৯) গল্পে অনেক মিল। বাদশা দ্য ডন (২০১৬) হয়েছে তেলেগু ডন সেনুর (২০১০) পর। ছবিগুলো মুক্তির আগেই নকলের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তাতে মুক্তি বা প্রদর্শন কিছুই থামেনি।

গান নিয়ে নীরবতা

ভারতীয় উপমহাদেশের ছবিতে গান একটি বড় বিষয়। অথচ নীতিমালায় গান নিয়ে কোনো কথাই নেই। যৌথ প্রযোজনার ছবিতে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভারতীয়দের একচেটিয়া রাজত্ব। বাদশা দ্য ডন, শিকারী, নবাব ও বস ২ ছবিগুলোর প্রতিটি গানের গীতিকার ও সুরকার ভারতের। নবাব-এর একটি গান বাদে বাকি সব গানের শিল্পীও ভারতীয়।

বস ২ ছবিতে জিৎ ও নুসরাত ফারিয়াসংস্কৃতির প্রতিফলনের ফাঁকা বুলি

নীতিমালা বলছে, যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে আবহমান বাংলা, বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সুষ্ঠু প্রতিফলন থাকবে (অনুচ্ছেদ-১)। দেশ ও মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শৈল্পিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা থাকবে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কিছু থাকবে না (অনু-২)। চিত্রনাট্য জাতীয় স্বার্থ, সংহতি ও সংস্কৃতিবান্ধব হবে (অনু-৩খ)।

কিন্তু হালে সাড়াজাগানো সিংহভাগ যৌথ প্রযোজনার ছবিতে দিকগুলো উপেক্ষিত। গত ঈদে তুমুল আলোচিত বস ২ ছবিতে বাংলাদেশের প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। নবাব, শিকারী, বাদশা দ্য ডন ইত্যাদি তুমুল হিট ছবিও একই দোষে দুষ্ট। ছবিগুলোতে এ দেশের সংস্কৃতি খুব দৃষ্টিকটুভাবে অনুপস্থিত। এর পেছনে নীতিমালাও প্রচ্ছন্নভাবে দায়ী। কারণ, বিষয়গুলোর কোনো ব্যাখ্যা বা সীমারেখা নেই। এসব বিমূর্ত ও অস্পষ্ট বিষয়ের একটা গ্রহণযোগ্য রূপরেখা দরকার।

শর্ত না মানলে কী হবে?

যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে আগে প্রিভিউ কমিটি থেকে চিত্রনাট্যের অনুমোদন লাগে। নির্মাণের পর একই কমিটির আরেক দফা অনুমোদন লাগে। নির্মিত ছবিটি যৌথ প্রযোজনার শর্ত-নীতিমালা অনুযায়ী না হলে প্রিভিউ কমিটি পর্যবেক্ষণ দেবে (অনু-৩ঘ)। সরাসরি বাতিলের বিধান নেই। অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ চলচ্চিত্রের মুক্তির একটা রাস্তা এখানে আছে।

নীতিমালায় থাকা জরুরি

যেকোনো প্ল্যাটফর্মে ছবির যেকোনো ধরনের প্রচারণামূলক কাজে দুই দেশের নির্মাতা ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের নাম থাকা বাধ্যতামূলক করা দরকার। কদিন আগে বিশাল সমারোহে কলকাতায় নবাব মুক্তি গেল। অথচ শাকিব খান ছাড়া বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব ছবির প্রচারে ছিল না।

যৌথ প্রযোজনার ছবি গোটা বাংলাদেশে চলে। বিপরীতে ভারতে শুধু কলকাতাতেই চলছে। বাংলাভাষী অন্যান্য রাজ্যে ছবিগুলো মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। দুই দেশের সমানসংখ্যক হলে ছবি মুক্তি দিতে হবে—এমন বিধানও নেই।

নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, অশ্লীলতা বা অপরাধসংক্রান্ত বিষয়গুলোর আরও সুনির্দিষ্টতা প্রয়োজন। যৌথ প্রযোজনার ছবি শুরু করার আগে দুই দেশের প্রযোজনা সংস্থা একটি চুক্তি করে। শিল্পী-কলাকুশলীর সংখ্যা, কাস্টিং কী হবে, শুটিং কোথায় হবে—এসব মূল বিষয় চুক্তিই নিয়ন্ত্রণ করে। চিত্রনাট্যের পাশাপাশি এই চুক্তিটিও প্রিভিউ কমিটির অনুমোদন করতে হবে—এমন শর্ত নীতিমালায় থাকা উচিত।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

শেয়ার করুন