সাংবাদিক নিয়োগঃ
আজকের নোয়াখালী শিক্ষানবীশ সাংবাদিক নিয়োগ - আগ্রহীরা সিভি পাঠিয়ে দিন আমাদের মেইলঃ ajkernoakhali2019@gmail.com এ
ধর্ষণ এখন সামাজিক ব্যাধি, কী করলে কমবে এ জঘন্য অপরাধ?

ধর্ষণ এখন সামাজিক ব্যাধি, কী করলে কমবে এ জঘন্য অপরাধ?

প্রতিকি ছবি

 

আবদুর রহমান,  আজকের নোয়াখালী  দেশে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ যখন প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনছে, লাশের মিছিল নিয়ে হাহাকার করছে! ঠিক এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও থামেনি ধর্ষক নামক সমাজের কিছু কীটের নোংরামি। ধর্ষক নামক নোংরা কীটগুলো সমাজকে আলোর পথ থেকে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে। এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু বাচ্চা থেকে বৃদ্ধা। দেশের প্রচলিত  আইন বা শাস্তিতেও দমানো যাচ্ছে না ধর্ষকদের।

কখনো ৯ বছরের শিশু, কখনো প্রতিবন্ধী বালিকা কখনো বা কিশোরীকে ২৫ দিন আটকে রেখে করা হয়েছে নির্যাতন। আবার এমনও দেখতে হয়, এই সমাজে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে স্বামীর সামনে থেকে নিয়ে গণধর্ষণ। স্বামীর হাহাকার শুনার মতো কি কেউ ছিল না এই সমাজে? একজন স্বামীর জন্য তা কতটা কষ্টের হতে পারে তা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

 

এই যে সেদিন নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলায় ধর্ষনের শিকার হলেন এক গৃহবধূ। গত ৩ জুন বিকালে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর বৈশাখী গ্রাম থেকে জমি কেনার উদ্দেশ্যে স্বামীকে নিয়ে কবিরহাট উপজেলার পূর্ব নবগ্রামে স্থানীয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান ওই গৃহবধূ। তারা সেখানে রাত্রিযাপন করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয় সমাজ কমিটির সভাপতি আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামের নেতৃত্বে ৬-৭ জন গৃহবধূর আত্মীয়ের বাড়িতে হানা দেন। ঘরে ঢুকেই ওই দম্পতির মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক থাকার কথা বলে তাদের বিয়ের কাগজপত্র দেখতে চান তারা। এক পর্যায়ে তারা ওই দম্পতিকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে তাদের সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেন।

এসময় গৃহবধূর স্বামী ও এক আত্মীয়কে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আব্দুস সাত্তার গৃহবধূকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে তার মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যান এবং সে সময় বাড়িতে কেউ না থাকায় গৃহবধূকে ধর্ষন করে। রাত ১২টার দিকে খুজতে খুজতে গৃহবধূকে উদ্ধার করতে তার খালাতো ভাই এবং স্বামী এসেছেন বলে ঘর থেকে বের করে স্থানীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে (বেড়ি বাঁধ) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নবগ্রামের সোহেল, আবুল কালাম, রিপন, মাসুম, গিয়াস উদ্দিন ও নূর আলম তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন। ভাগ্যে ছিল হয়তো ঐ গৃহবধূর বেঁচে থাকা, তাই হয়তো এই সমাজে এখনো বেঁচে আছে।

এবার দেখুন সমাজের বর্তমান অবস্থা কোথায়? একটা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বাবা অসুস্থ (ঢাকায় চিকিৎসাধীন)। তার মা ও ঢাকায় অবস্থান করছেন। নানার বাড়ি থেকে গত শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে সে বাড়ি আসে। শনিবার তার ও ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল। হয়তো তার ইচ্ছে ছিল অন্য সবার মত বাবার হাত ধরে জীবনের স্বপ্নগুলো পূরণ করার কিন্তু এই বর্বর সমাজের কীটগুলো দেয়নি তার সে স্বপ্ন পূরণ করতে। তাদের যৌন ক্ষুধার বলি হতে হয় তাকে। গৃহবধূ এবং কিশোরীর মত প্রতি বছর হাজার হাজার নারী শিকার হয় সমাজের ওই নোংরা কীটদের যৌন নির্যাতনের।

 

কেন সমাজের এই অবস্থা? সমাজ কেন দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে? তা নিয়ে কথা হলো, নোয়াখালী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. মাহফুজুর রহমান।

তিনি বলেন- সর্বপ্রথম আমাদের বুঝতে হবে ধর্ষণ কী? ধর্ষণ হলো ধর্ষণ এক ধরনের যৌন আক্রমণ। একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। এটা একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। আর এজন্য সামাজিক কাঠামো অনেকক্ষেত্রে দায়ী। যেহেতু ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি সেহেতু এটা সে ঘটাচ্ছে বার বার। সামাজিক ও মনঃস্তাতিক কারণ উৎঘাটন ছাড়া অপরাধ নিমূল সম্ভব নয়। তাই সামাজিকভাবেই একে প্রতিহত করতে হবে। এই জন্য ছেলে মেয়েদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে ছোট বেলা থেকেই। শিশুদের চরিত্র গঠনে সকল প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্মীয় বিধি নিষেধের আলোকে শিশুদের চরিত্র গঠনে জোর দিতে হবে।

ঠিক কোন মনস্তাত্ত্বিক কারণে মানুষ এমন জঘন্যতম কাজ করতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে বলতে গেলে বিখ্যাত নিউরোলোজিস্ট এবং পরবর্তীতে সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রয়েডের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছেন- মানুষের মন মূলত তিনটি উপাদান নিয়ে গঠিত হয়ে থাকে ইড, ইগো এবং সুপার ইগো। ‘ইড’ মূলত মানুষের জৈবিক সত্ত্বা। যা মানুষের মনের স্বভাবজাত চাহিদা পূরণ করে থাকে। এটিকে আমরা বলতে পারি ‘মন যা চায় তাই করা’।

মানবিক দিকহীন বা বিকাশহীন হচ্ছে ‘ইড’। যাকে আমরা আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু ও বলতে পারি। যা মানুষ এবং পশু সবার মাঝেই সমানভাবে বিদ্যমান। এটি মূলত পুরোটাই লোভ লালসা ও কাম চিন্তায় ভরপুর। এটি মানুষকে এমনভাবে আকর্ষণ করে যে এর প্রভাবে মানুষ যে কোন অসামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে, ধর্ষণ এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতেও দ্বিমত পোষণ করে না।

আর ‘সুপার ইগো’ হচ্ছে মানুষের বিবেক। আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু যখন জৈবিক কামনা বাসনা পুরণ করতে উৎসাহী হয়, তখন সুপার ইগো একে বাধা দেয়। এটির কাজই হচ্ছে মানুষকে সব সময় মানবিক দুর্বলতার উর্ধে উঠে ভাল কাজ করার জন্য মানুষকে উৎসাহী করা। এই বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নির্ভর করে থাকে একজন ব্যক্তির নৈতিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মুল্যবোধের উপর।

তাই তারা কেবল জৈবিক চাহিদা (খাবার এবং যৌনতা) পূরণেই ব্যস্ত। আবার মানুষের মধ্যে যখন ‘ইড’ ডমিনেন্ট হয়ে যায়, তখন সে উন্মাদ ও অমানুষ হয়ে যায়। আর যখন কেবল সুপার ইগো কাজ করে– তখন সে সাধু সন্যাসী পবিত্র হয়ে যায়। ইগো এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

একটি উদাহরণ দিচ্ছি তাহলে বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে-
ধর্ষণ করলে মনের কামনা এবং শরীরের যৌন ক্ষুধা মিটিবে, অতএব ধর্ষণ করো। (ইড)

ধর্ষন করা অসামাজিক কাজ, নৈতিকতাবিরোধী, এর জন্য শাস্তি পেতে হবে, অতএব ধর্ষণ করা যাবে না। (সুপার ইগো)

নির্জনে নিরিবিলিতে আড়ালে গিয়ে ধর্ষণ করো, অসুবিধা কী? কেউ তো দেখবে না, আর শরীরের চাহিদা ও মিটবে (ইগো, ব্যালেন্স করতেছে দুই দিক) এমন চিন্তাধারা থেকেই মানুষ অপরাধ করে থাকে।

 

আর এই জন্য প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। একইসাথে প্রকৃত ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মিডিয়াকে বেশি বেশি সোচ্চার হতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে মিডিয়ায় বেশি বেশি নিউজ করতে হবে। এবং সমাজের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। যেমনটা ফেনীর নুসরাতের জন্য আমরা করেছিলাম।

 

একজন মানবাধিকার কর্মী বলছেন, অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার জন্য দেশে আইন রয়েছে; তবে একমাত্র আইনই এই অমানবিক অপরাধকে নির্মূল করতে পারে না। নির্মূল করতে হলে অবশ্যই অপরাধের মূলে গিয়ে সমাজ থেকে সমূলে এই ব্যাধিকে বিনষ্ট করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন ধর্ষিতার বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।  আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, ধর্ষক অপরাধী, ধর্ষিতা নয়। তাই ধর্ষককে কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি সমাজকে ধর্ষিতা নারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে এবং সমাজে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার বিষয়ে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

 

নোয়াখালীর যে কোনো আপডেট খবর জানতে আমাদের ফেইজবুক পেইজ আজকের নোয়াখালী’তে চোখ রাখুন

 

শেয়ার করুন