সাংবাদিক নিয়োগঃ
আজকের নোয়াখালী শিক্ষানবীশ সাংবাদিক নিয়োগ - আগ্রহীরা সিভি পাঠিয়ে দিন আমাদের মেইলঃ ajkernoakhali2019@gmail.com এ
মুক্তামণির জন্য শুভকামনা

মুক্তামণির জন্য শুভকামনা

মুক্তামণি
ছোট্ট মুক্তামণির শরীরটা বিছানাবন্দী, কিন্তু মনটা প্রজাপতির পাখনা মেলে ঘুরে বেড়ায়। হাত দিয়ে ছবি আঁকার শক্তি না পেলেও মনের ক্যানভাসে এঁকে চলে নানান ছবি। কণ্ঠে আছে গানের সুর। কিন্তু একটুতেই হাঁপিয়ে যায়। বাবার কাছে মুক্তামণির কত বায়না। কদিন পরই কোরবানির ঈদ। বাড়ি ফিরে হাতের কবজি ডুবিয়ে কোরবানি দেওয়া গরুর মাংসের ঝোল দিয়ে সে ভাত খাবে। মায়ের কাছে তার এ ইচ্ছার কথা জানিয়ে রেখেছে।

দুই বিনুনি দুলিয়ে বোন হীরামণির সঙ্গে স্কুলে যাবে। আর একমাত্র ছোট্ট ভাইটাকে জন্মের পর থেকে তো কোলেই নিতে পারল না। চোখের সামনেই বড় হচ্ছে ভাইটি। তাকে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে কোলে নিয়ে আদর করতে হবে। কাজ আরও বাকি আছে। মুক্তামণি বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চায়। কাউকে যাতে তার মতো এমন অবস্থার শিকার না হতে হয়, সে চেষ্টা তো তাকেই করতে হবে। কেননা মুক্তামণি জানে তার অবর্ণনীয় কষ্টের কথা। অথচ তার বয়স ১০ কি ১১ বছর।

মুক্তামণির বাবা ইব্রাহিম হোসেনের এক কথা, ‘আপনারা সবাই দোয়া করবেন, আমার আম্মু, আম্মুজান মেয়েটা যাতে আবার আমার বুকে ফিরে আসতে পারে। আমি তার সব বায়না মেটানোর জন্য তৈরি।’

রক্তনালির টিউমারে আক্রান্ত মুক্তামণি এখন সবার কাছে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। সব ধরনের খোঁজখবর নিচ্ছেন। কাল শনিবার সকালে মুক্তামণির হাতে অস্ত্রোপচার হবে।

সাতক্ষীরায় জন্মের দেড় বছর বয়স থেকে মুক্তামণির ডান হাতের সমস্যার শুরু। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তার ডান হাতটি ফুলে অনেকটা কোলবালিশের মতো হয়ে যায়। সে বিছানাবন্দী হয়ে পড়ে। মুক্তামণির রোগ নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। গত ১১ জুলাই মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

এ পর্যন্ত মুক্তামণিকে একটু দেখার জন্য, শুভকামনা জানানোর জন্য বার্ন ইউনিটে এসেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ক্রিকেট দলের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমসহ অনেকেই। মুক্তামণির এখন যে অবস্থা, তাতে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরই প্রয়োজন সবার দোয়া। সবার ভালোবাসা ও দোয়ায় সৃষ্টিকর্তা হয়তো মুখ তুলে চাইবেন বলেই ভরসা করে আছেন চিকিৎসকেরাও।

মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের জন্য সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার কথা হয়েছিল। তবে সেখানকার চিকিৎসকেরা ভিডিও কনফারেন্স করে ও বিভিন্ন রিপোর্ট দেখে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা মুক্তামণির অস্ত্রোপচার করতে পারবেন না। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিশেষ করে বার্ন ইউনিটের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল কালামসহ অন্যরা হাল ছাড়েননি। তাঁরা সাহস করে এগিয়ে এসেছেন। তা না হলে মুক্তামণিকে হয়তো এ পৃথিবী থেকেই বিদায় জানাতে হবে। অস্ত্রোপচারেও সে ঝুঁকি আছে। জীবন বাঁচানোর জন্য ওর হাত কেটে ফেলতে হতে পারে। কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে।

মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের জন্য বার্ন ইউনিটের দুটো অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অস্ত্রোপচারের পরবর্তী তিন দিন মুক্তামণিকে দেখার জন্য দল গঠন করা হয়েছে। এই দলের চিকিৎসক, নার্সরা শুধু মুক্তামণিকে দেখবেন।

আজ শুক্রবার সকালে মুক্তামণির জ্বর এসেছে। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, সন্ধ্যা নাগাদ জ্বর ভালো না হলে হয়তো অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মুক্তামণির শরীরের যে অবস্থা তাতে করে জ্বর হবে, এটা-ওটা সমস্যা হবে, তা আমরা মাথায় রেখেই অগ্রসর হচ্ছি। রক্তনালির টিউমার কোনো বিরল রোগ নয়। কিন্তু মুক্তামণিকে আমরা যে অবস্থায় পেয়েছি তাকে বিরল না বলে উপায় নেই। টিউমার ছড়িয়েছে অনেক দূর। তার লিভার বড়। একটা ফুসফুস কাজ করে না। সমস্যা অনেক। এ পথে না গিয়ে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তা না হলে ওকে ছেড়ে দিতে হবে। এখন সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’

গণমাধ্যমে প্রচারের কারণে মুক্তামণিকে এখন সবাই চেনে। তা উল্লেখ করে সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমি যেখানেই যাই সেখানেই অনেকে নিজে থেকে এসে বলেন, আমরা মুক্তামণির জন্য দোয়া করছি। অনেকে আমার মুঠোফোনে খুদে বার্তায় মুক্তামণির জন্য শুভকামনা জানাচ্ছেন। কেউ তাঁরা একেবারে সাধারণ জনগণ আবার কেউ কেউ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আর প্রধানমন্ত্রীর শুভকামনা তো আছেই। আমরা চিকিৎসকেরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব। আর অগণিত মানুষের শুভকামনা নিয়েই আমরা কাল অস্ত্রোপচারের টেবিলে হাজির হবো।’

মুক্তামণির অস্ত্রোপচারে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, অন্য হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েকজন সার্জনও অংশ নেবেন।

মুক্তামণির মা আসমা খাতুন স্বপ্ন দেখছেন মেয়ে হাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। কিশোরী মেয়ে যখন-তখন দুই হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে পরে।

শেয়ার করুন