সাংবাদিক নিয়োগঃ
আজকের নোয়াখালী শিক্ষানবীশ সাংবাদিক নিয়োগ - আগ্রহীরা সিভি পাঠিয়ে দিন আমাদের মেইলঃ ajkernoakhali2019@gmail.com এ
নিউজিল্যান্ডের খুনিটা যে কারখানায় তৈরি

নিউজিল্যান্ডের খুনিটা যে কারখানায় তৈরি


বন্দুক হাতে ঢুকে পড়ল এক লোক…। পাঠক, এখন শূন্যস্থানে একেকটি জায়গার নাম লিখব আর দেখব কীভাবে ঘটনার মানে বদলে যায়। এই অদল ও বদলের বিষয়টি এখন বহুল আলোচিত। আমি শুধু বলাটা ধার করছি এখানে।

বন্দুক হাতে লোকটি ঢুকল স্কুলে, চালাল নির্বিচার গুলি। শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান এই লোকটিকে তখন বলা হবে মানসিক ভারসাম্যহীন। সমাধান: ওকে আটকে রেখে চিকিৎসা করো।

বন্দুক হাতের লোকটি মুসলমান? তাহলে এটা নির্ঘাৎ এক ‘জেহাদি’ সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র। সমাধান: মুসলমান খেদাও।

বন্দুক হাতে লোকটি যদি ইসরায়েলি অথবা মার্কিন সেনা হয়, তাহলে তার পরিচয় হবে সভ্যতার প্রহরী। তাদের বীরের খেতাব দাও।

বিশ্বের এমন কোনো রাষ্ট্রনেতা আছেন, যিনি বন্দুক হাতে ছবি তোলার পোজ দেননি? গায়ে চড়াননি সামরিক পোশাক? তাঁরা এসব করেন একদিকে যুদ্ধব্যবসায়ীদের হাতে রাখতে অন্যদিকে অক্ষম জনতাকে চেতিয়ে ভোট বাড়াতে।

বন্দুকের পরিচয় নেই কে বলল? বন্দুক বানায় কোম্পানি, বন্দুক হলো লোভনীয় ব্যবসা। বেশির ভাগেরই মালিক পশ্চিমা। এসব কোম্পানির মালিকেরা হয়তো খালি হাতে একটা মশাও মারেন না, তাঁদের অনেকেই মস্ত বড় দানবীর, টেলিভিশন ছাড়া আর কোথাও তাঁরা যুদ্ধ-হত্যা দেখেনও না। রক্তপাত সয় না বলে এঁরা প্রায়শই নিরামিষ ভোজন করেন। কিন্তু বন্দুক হাতে যারা মানুষ মারতে আসে, তারা ওই সব ব্যবসারই ভ্রাম্যমাণ ক্রেতা-বিক্রেতা। যারা ইরাকে-আফগানিস্তানে-সিরিয়ায়-সোমালিয়ায়-ইয়েমেনে বা রাখাইনে মানুষ হত্যা করে আসছে, তাদের পেছনে পাওয়া যাবে ওইসব কোম্পানি ও ওইসব মহান নেতাদের লম্বা লম্বা হাত।

অথচ শিকড়ের দিকে না, লতাপাতায় জড়ায়ে যায় আমাদের মন ও মগজ। তাই ‘সন্ত্রাসী’ পরিচয় কেবল মুসলমানদের জন্যই বরাদ্দ। অথচ এফবিআই ডেটাবেইস থেকে বের হওয়া একটা প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৮০-২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটা মাত্র ৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনায় মুসলিম সন্ত্রাসীরা জড়িত ছিল। যুদ্ধাক্রান্ত সিরিয়াকে বাদ দিলে ২০১৬-১৭ সালেও বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে অমুসলিমদের দ্বারা (গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০১৮)।

ব্রেইভিকের দায় সব সুইডিশকে নিতে হয়নি। ২০১১ সালে অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামের এক ব্যক্তি নরওয়েতে গুলি ও বোমা ফাটিয়ে এক ঘণ্টা ধরে মোট ৭৭ জনকে হত্যা করেন। এর আগে নিজের ব্লগে তিনি মুসলিমবিদ্বেষী কথাবার্তা লেখেন। নরওয়ের মতো নিউজিল্যান্ডও শান্তির দেশ বলে পরিচিত। কিন্তু এই শান্তি সাম্প্রদায়িক ঘাতক মানসিকতা তৈরি ঠেকাতে পারেনি। ব্রেইভিককে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলেননি সে দেশের আদালত। নিয়মিতভাবে পাখির মতো করে স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের হত্যা করা মার্কিন ঘাতকেরাও নিতান্তই ‘অসুস্থ’। মুসলমান হলে নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক ও সামরিক প্রশ্ন, আর অন্য ধর্মের হলে হয়ে দাঁড়ায় মানসিক সমস্যা। ফ্রান্সের শার্লি হেবদোতে গুলি করে কয়েকজন হত্যার পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, দায়ী করা হয় মুসলমান জনগোষ্ঠীকে। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের এত বড় ঘটনার পর বিশ্বের বস্ত্রহীন সম্রাট ট্রাম্প সাহেব এখনো নির্বিকার।

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপে গণহত্যার শিকার হওয়া ইহুদি যুবকেরা যখন ফিলিস্তিনে বোমা ফাটাচ্ছিলেন, বন্দুক হাতে নাশকতা করছিলেন, তখন তাঁদের বলা হলো মুক্তিযোদ্ধা। আর ফিলিস্তিনিরা যখন তাদের হারানো জীবন ও জমি ফিরে পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন তাদের নাম দেওয়া হলো ‘সন্ত্রাসী’। ১৯৭১–এ পাকিস্তানের চোখে যারা ‘সন্ত্রাসী’, তারাই বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা। কারও সন্ত্রাসী, কারও মুক্তিযোদ্ধা; কিন্তু যারা মারা যায় তারাও মানুষ। মসজিদে বা মাজারে, স্কুলে বা বাসে, ঘরে বা হাসপাতালে মানুষেরই মৃত্যু ঘটে চলেছে। এবারেও অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেনন

কিন্তু সব মৃত্যু নয় সমান। বন্দুক হাতের লোকটি যদি শ্বেতাঙ্গ না হয়ে কালো বা বাদামি হতো, হতো মুসলমান বা হিন্দু; তবে তাদের ধর্মোন্মাদ বলায় কোনো কসুর করত না অধিকাংশ পশ্চিমা গণমাধ্যম। যদি বন্দুক হাতের লোকটি কোনো কৃষক মাওবাদী হতো, তখনো ‘সন্ত্রাসী’ খেতাব আর দেখামাত্র গুলির নির্দেশ তাদের প্রাপ্য হতো। তাই সব বন্দুকবাজও নয় সমান।

ব্রেইভিকের মতো নিউজিল্যান্ডের বন্দুকধারীরা জানে, আইন তাদের ধরলেও পাশ্চাত্যের ডানপন্থীদের কাছে তারা হবে ‘বীর’। ঠিক এমন আশ্বাসে ভর করেই মুসলমান তরুণদের কেউ কেউ যোগ দেয় আল–কায়েদা কিংবা আইএস-এ।

ইরাক-সিরিয়া-লেবানন-আফগানিস্তান-সোমালিয়া-আরাকান—যেখানেই যুদ্ধ ও সহিংসতা চলেছে, গণহত্যা চলেছে, বিতাড়িত হয়েছে লাখো মানুষ; সবখানেই পাওয়া যাবে পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক লীলাখেলা। তেলের জন্য, বন্দরের জন্য, সামরিক সুবিধার জন্য চালানো এসব যুদ্ধের প্রধান শিকার ওই সব দেশের মানুষ। আপনি সুবিধা নেবেন, কিন্তু শরণার্থী নেবেন না, তা হয় না। আপনি বিশ্বায়নের নামে দেশে দেশে প্রভাব বাড়াবেন, বাজারে দাপট চালাবেন

শেয়ার করুন